জনপ্রিয় লেখকের মৃত্যু ও আমাদের গোয়েন্দাগিরি
বাংলাদেশে সম্প্রতি অতি জনপ্রিয় একজন লেখক মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনারা সবাই তার নাম জানেন বলাই বাহুল্য। আমি তার নাম উল্লেখ করছি না কারণ আমি চাইনা যে পাঠকের দৃষ্টি বা মন লেখার মূল পয়েন্টের বাইরে পড়ে থাকুক। এই টেকনিক কতটা কাজে আসবে বুঝতে পারছি না। কারণ হুজুগে বাঙ্গালি বাস্তবিকই হুজুগের বাইরে মনঃসংযোগ করতে পারে না – এটা আমার দীর্ঘদিনের উপলব্ধি। আশা করি এই লেখাটি পড়ার সময় পাঠক তার হুজুগেপনাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন। সংযমের মাসে এটা খুব কষ্টসাধ্য হওয়ার কথা নয়।
লেখকের মৃত্যুর পর আমি খেয়াল করলাম যে দু’দল মানুষ তার ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছেন। একদল তার ইতিহাস ঘেঁটে তার ‘মুনাফিকী’র ফিরিস্তি বের করে নিয়ে এসেছেন। আরেকদল পারলে শাহজালালের মাজারের মত আরেকটি মাজার বসিয়ে দেন তার কবরের ওপর। লেখকের কাজের সাথে আমার পরিচয় আছে। তার ধর্মীয় চিন্তা আমাদের প্রচলিত সমাজ ও তার ধ্যান-ধারণারই প্রতিফলন। সময়ে সময়ে তার লেখায় ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি ভালোবাসা যেমন প্রকাশ পেয়েছে তেমনি বিভিন্ন কাজে তার ইসলামি বিষয়সমূহে ভুল ধারণা ও অজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষ তো আর রোবট নয়, রক্ত মাংসের মানুষের যেমন ঈমান ওঠা নামা করে তার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। পার্থক্য একটিই, তিনি জনপ্রিয় লেখক বলে তার ধ্যান-ধারণা আমজনতার বিকেলের নাস্তার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা যারা ইসলামমনা তাদের একটি বড় দায়িত্ব ছিল লেখকের ভুল-ভ্রান্তি তার জীবদ্দশায় ধরিয়ে দেয়া। সেটা যখন আমরা করতে পারিনি তখন তার মরদেহকে জান্নাত বা জাহান্নামে পাঠানোর পবিত্র দায়িত্ব আমাদের নেয়ার দরকার নেই। এর জন্য বেটার অথরিটি আছে, আমাদের এত উতলা হওয়ার প্রয়োজন কী? তার পারলৌকিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের অতিরিক্ত মাথা ঘামানো আমাদের হুজুগেপনার কফিনে আরেকটি পেরেক। এটি শেষ পেরেক নয়। শেষ পেরেক অনেক আগেই কফিনে বসে গেছে। তার পরেও আমরা পেরেক ঠুকেই চলেছি!
মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান ধরে রাখা ইসলামি সংস্কৃতির একটি অংশ যার গোড়াপত্তন করে গেছেন খোদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। একবার তার সামনে এক ইহুদি ব্যক্তির মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তা দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন (সম্মান-পূর্বক)। সাহাবীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ও রাসূলাল্লাহ! সেতো ইহুদি”। প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দেনঃ “কিন্তু সে কি একটি নাফ্স (আত্মা) নয়”? তাই একজন ইহুদির মরদেহ যদি আল্লাহ্র রাসূলের (সাঃ) কাছে সম্মান পেতে পারে তাহলে এই লেখক মৃত্যুর পর যে আমাদের কাছে কিছু সম্মান আশা করতে পারেন সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি আমাকে চূড়ান্ত ভাবে মর্মাহত করেছে তা হল লেখকের দু’পক্ষের পরিবারকে নিয়ে সাধারণ মানুষের অহেতুক নাক গলানো। নাক গলানোতেই ব্যাপারটি খালি সীমাবদ্ধ ছিলনা বরং দু’পক্ষের পরিবারকে নিয়ে কানাঘুঁষো থেকে শুরু করে অকথ্য গালাগালি ফোরামগুলিতে পাওয়া গেছে। পাঠক বা শোনকরা যারা কোন কমেন্ট করছেন না তারাও যেন এই হট গসিপের প্রতিটি দানা আস্বাদন করে তৃপ্তির পরম ঢেঁকুর তুলছেন। এরকম অস্বাস্থ্যকর ব্যক্তিত্ব আমরা কোথায় অর্জন করলাম সেটা আল্লাহ্ই ভালো জানেন। পুরো জাতির মধ্যে সীমালঙ্ঘন করা ও হিতাহিতজ্ঞানশূণ্যতা ন্যাক্কারজনক ভাবে চোখে পড়ছে।
প্রায় দেড় যুগ আগে লেখকের একটি নাটক দেখে কাহিনী পরিবর্তনের দাবীতে মানুষ মিছিল বের করেছিল। সবাই তখন লেখকের মুন্সিয়ানাকে পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিলেন। খুব কম লোকই চিন্তা করেছেন যে এই ঘটনায় প্রমাণিত হয় আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ কী পরিমাণ মানসিক অপরিপক্কতা নিয়ে দিন গুজরান করছে। একটি সাজানো কাহিনী নিয়ে যে জাতি হতবিহবল হয়ে যায় তারা সত্যি ঘটনায় যে ইমোশনের ফালুদা বানিয়ে ফেলবে সেরকম আশঙ্কা ছিলই। এবং হয়েছেও তাই। কল্পনাপ্রবণ জাতি তাদের প্রিয় লেখকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একের পর এক কাহিনী নিজেরাই ফেঁদে চলেছে এবং মৃত্যুপূর্ব বিভিন্ন ঘটনাকে মালমশলায় জড়িয়ে এখন বারবিকিউ করে খাচ্ছে। আরেকদল নিরবে হাততালি দিয়ে চলেছে। মিডিয়ার পোয়াবারো। কাটতি বাড়াতে হেন সুকর্ম নেই যা তারা করতে রাজি নন। লেখকের পরিবারের কেউ কেউ অকথ্য গালাগালির শিকার হয়েছেন এবং তাদের দিকে অন্যায় সন্দেহের অঙ্গুলি প্রদর্শন করতে কেউ কার্পণ্য করছেন না। হঠাত করে পুরো জাতিই গোয়েন্দাবাহিনীতে পরিণত হয়েছে এবং লেখকের অসুস্থসময়ের বিভিন্ন ছোট ছোট ঘটনার কাটপিস জোড়া লাগিয়ে তারা তিল থেকে তাল বের করছে। সময় আমাদের কতইনা বিস্তৃত, আর কাজও কত কম!
আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) একটি হাদীসে বলেছেনঃ “একজন ব্যক্তির সুন্দর ইসলামের একটি পরিচয় হল যে সে ওই ব্যাপারে মাথা ঘামায় না যা তার প্রয়োজনের আওতাভুক্ত নয়”। হাদীসটি যদিও শাস্ত্রীয় নিয়মানুযায়ী নির্ভরযোগ্য বা সহীহ নয় কিন্তু এর অর্থের সাথে ইসলাম একমত। আমরা যতই দাবী করি না কেন, ইসলামি মতানুযায়ী একজন ব্যক্তির ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার তার পরিবারের। এই অধিকার ব্যক্তির জনপ্রিয়তার পারদের সাথে ইনভারস্লি প্রোপরশনেট নয়, বরং তা সর্বদাই কন্সট্যান্ট। আমাদের কখনোই ব্যক্তিগত বা সামষ্টিকভাবে এই অধিকারে হাত বসানোর চিন্তাও করা উচিত নয়।
এরচেয়েও জঘন্য ব্যাপার হল মানুষের সম্ভ্রমে হাত দেয়া যা এই ঘটনায় অহরহ মানুষকে করতে দেখা গেছে। ইসলামে একজন মানুষের সম্মান এবং তার রক্ষণাবেক্ষণকে বিরাট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আজ যারা লেখকের পরিবারের কোন সদস্যকে নিয়ে কটু কথা বলছেন তারা কি জানেন যে এই অপরাধ ইসলামে কতটা গুরুতর? মানুষের সম্মান হরণ করার অপরাধ শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে তওবা করার মাধ্যমে শুধরে নেয়া যাবে না। বরং অপমানিত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে এবং পাইতে হবে তবেই তার প্রায়শ্চিত্ত হবে। যারা আজ এই গনগীবতে অংশ নিচ্ছেন তাদের ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছে মানুষকে হ্যারাস করা ও মানসিক ভাবে অপদস্থ করার জন্মগত অধিকার নিয়ে দুনিয়াতে এসেছেন। আল্লাহ্ যখন আমাদের পাকড়াও করবেন এবং এব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন তখন কী জবাব দেব আমরা?
কোন ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা ইসলাম অপছন্দ করে। অথচ প্রায় তের কোটি (বা তারও বেশী) মুসলিমের দেশে আমরা বাড়াবাড়ির বাড়াবাড়িতে মোক্ষ লাভ করতে চলেছি। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি কবে?
Posted on অগাষ্ট 3, 2012, in Arts & Entertainment, Character & Morals, Etiquettes & Manners, News & Views and tagged হুমায়ুন আহমেদ, humayun ahmed. Bookmark the permalink. 8 টি মন্তব্য.
alhamdulillah, nice work.
My request, please never quote any hadith which is not authentic (আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) একটি হাদীসে বলেছেনঃ “একজন ব্যক্তির সুন্দর ইসলামের একটি পরিচয় হল যে সে ওই ব্যাপারে মাথা ঘামায় না যা তার প্রয়োজনের আওতাভুক্ত নয়”। হাদীসটি যদিও শাস্ত্রীয় নিয়মানুযায়ী নির্ভরযোগ্য বা সহীহ নয়). Our Islam is not so weak that we need to take support from any unauthentic hadith. If we take the support from any weak hadith, it basicaly open the door of acceptance of weak/false hadith, and spreading it. Hope you will realize the inner part of my comments.
Rony bhai, thanks for your valuable comment. Scholars though have allowed quoting a weak hadith if its meaning is correct and if its weakness is made clear which I did. Secondly the hadith is not entirely weak, many scholars have said its a Hasan hadith, which is a category between Saheeh and Daeef (weak). Some scholars do accept Hasan hadith.
Alhamdulillah, Asif bhaia,great write up. One issue could enrich it that, while commenting about the family of the concerned author, we were/are following nothing but congectures. Sura hujurat extensively deals with the impermissibility of this job!
good point. But tumi amader blog ey likhba kobe bolo?
nice though sharing…….but i am strong arguing with one point…..natok niya misil bar kora mane e ja amra jati hishaba oporipokko it is not the point….rather the whole nation evolve with the story and the character so much that …they react that’s way….i remember when that play was broadcasted i was just a kid…but i was continually crying more than one week for baker bhay……it is ok to write something to prove that how much intellectual your are among your dumb nation…..but remember amra jokhon kauka bhalo bashi tokhn ato ta e bahlo bashi ja negetive kissu shatha chola asa…definitly it is not a curse……………..
কয়দিন আগে আমার পরিচিত এক আন্টি রোজা রেখেছিলেন যেন হিন্দি চ্যানেলের এক নায়িকার সাথে খলনায়কের বিয়ে না হয়ে যায় জন্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অসুস্থতার প্রকট উপস্থিতি আছে – যেটা আমাদের আলোচনায় কমই উঠে আসছে, হয়ত ব্যাপারটাকে আমরা জরুরী মনে করছি না সেজন্য।
Aro Lekha Chai…Jate Amader Hedayater Bepare Amra Shocheton Hobo
du’a korben.