নিজেই যখন ড্রাইভার (চালক)
শহরবাসীরা সাধারণত অনেকদিন শহরে থাকলে একটু শহরের বাইরে ঘুরে আসতে পছন্দ করেন। কারণ বেশিদিন এক পরিবেশে থাকলে জীববটা একঘেয়েমিপূর্ণ হয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক। অনেকে হয়ত নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে কক্সবাজার বা বান্দরবানের মত জনপ্রিয় জায়গায় একটু গ্রিন দেখতে যেতে পছন্দ করেন। তাই আমিও যাচ্ছিলাম ঢাকার বাইরে; তবে নিজে ড্রাইভ করছিলামনা; ভলভো বাসে করে যাচ্ছিলাম একটু গ্রিন দেখতে; ড্রাইভারের বিভিন্ন কার্যকলাপগুলো দেখছিলাম, তিনি কি করছেন তা; আঁকাবাঁকা পথ ধরে ড্রাইভিং করছেন, মাঝে মাঝে ব্রেক কষছেন, স্পীড হাই-স্লো করছেন, হর্ন দিচ্ছেন, রাস্তায় জ্যামে অসাড় হয়ে বসে আছেন, পেট্রোল পাম্প থেকে তেল ভরলেন এবং মাঝপথে খাওয়ার জন্য গাড়ি থামালেন ইত্যাদি।
অনেকদিন পর যখন ব্যপারটা মনে পড়ে গেল একটি প্রশ্ন মনে আসতে লাগল, গাড়ি চালাতে পারলেই কি কাউকে আমরা চালক বলব; নাকি আমরা সবাই ড্রাইভিং করছি? আসুন একটু অন্যভাবে দেখি ব্যপারটাকে, একজন চালক যেমন গাড়ির পরিচালনা করছেন তেমনিভাবে আমরা সবাই ড্রাইভার আর আমরা ড্রাইভ করছি নিজেদেরকে।
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে যদি রাস্তা ধরি আর জীবনটাকে ধরি একটা গাড়ি, তাহলে আপনি হচ্ছেন তার চালক। এখন একবার ভেবে দেখুন সঠিকভাবে ড্রাইভ করে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে না পারলে আপনাকে কতইনা সমস্যায় পড়তে হবে। অদ্ভুত রিলেশেন মনে হতে পারে, আসুন ব্যপারটাকে আরেকটু লজিকাল ভাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করি। আপনাকে শুধু ভাবতে হবে যে আপনি নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন।
মনে করুন আপনি আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি চালাচ্ছেন আর সামনে অপ্রত্যাশিতভাবে একটা ট্রাক চলে আসল আপনি কি করবেন? কষে হার্ড ব্রেক করবেন যাতে এক্সিডেন্ট যথাসম্ভব এড়ানো যায়। এবার ভেবে দেখুন আমরা প্রতিদিন নামাজে সূরা ফাতিহাতে এই দুয়া/আয়াত পড়িঃ اهدِنَــــا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ – “আমাদেরকে সরল পথ দেখাও”। কিন্তু আমরা নিজেদেরকে সরল পথে রাখতে পারিনা; বিভিন্ন গুনাহ-এর মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে আঁকাবাঁকা পথে নিয়ে যাই। সুদ, ঘুষ, জিনা, ব্যভিচার, গীবত, মিথ্যাকথা আরও কতভাবে যে আমরা এই বাঁকা পথগুলো বেছে নেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু আমরা কি ব্রেক করছি?
এখানে ব্রেক বলতে আমি বুঝাতে চাইছি যত গুনাহের কাজ আছে তা থামিয়ে দিয়ে আল্লাহ-এর কাছে মন থেকে তওবা করে ফেলা এবং সেই গুনাহের কাজ আর না করা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সূরা আত-তাওবাহ এর আয়াত ১১ তে বলেছেন -
فَإِن تَابُواْ وَأَقَامُواْ الصَّلاَةَ وَآتَوُاْ الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَنُفَصِّلُ الآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
“অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি”
আরেকটি ব্যপার হল, পথিমধ্যে যদি গাড়ি বন্ধ হয়ে যায় অথবা গাড়ি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আমাদের ওয়ার্কশপে যাওয়া লাগে গাড়ি ঠিক করার জন্য; অথবা তেল নেয়ার দরকার হলে পেট্রোল পাম্পে গিয়ে তেল ভরতে হয়। কারণ আপনি তো নিশ্চয় গাড়ি রাস্তায় ফেলে যাবেননা অথবা আপনি রাস্তায় বসে থাকবেননা। ঠিক তেমনি আমাদের অন্তরের কিন্তু এরকম রিচার্জের প্রয়োজন পড়ে, আর আমার মতে “অন্তরের ওয়ার্কশপ হচ্ছে মসজিদ” – যেখানে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর একটি ইবাদত – নামায পড়তে পারি। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছেন – “আমার চোখের শীতলতা নামাযের মধ্যেই অন্তর্নিহিত”। নামায ছাড়াও মসজিদে হয় ইসলামিক আলোচনা, কুরআনের তাফসির ইত্যাদি।
কালামুল্লাহ এর ওয়েবসাইট থেকে – নামায এর ব্যপারে ইমাম ইবন কাইয়িম তার ‘যাদ আল মাদ’ এ খুব সুন্দর কিছু জিনিস বলেছেন যা নিম্নে উল্লেখ করলাম। এই স্কলারের মতে নামায যেভাবে আমাদের উপকারে আসে -
- Attracts good livelihood
- Improves health
- Staves off harm
- Keeps away diseases
- Strengthens the heart
- Brightens the face
- Delights the soul
- Takes away laziness
- Invigorates the organs
- Replenishes energies
- Refreshes the heart
- Nurtures the spirit
- Enlightens the mind
- Preserves the boon
- Prevents adversity – Punishment
- Brings the blessings
- Drives away Satan
- Draws closer to the Almighty Allah
আর আমরা যেভাবে আমাদের গাড়ির পরিচর্যা করি সেভাবে আমরা নিম্নের এই জিনিসগুলোর পরিচর্যা করিনাঃ
- অন্তর বা নিয়তের
- সঠিক জ্ঞানের অন্বেষণ (বিশেষভাবে ইসলামিক জ্ঞান)
- কুরআন আর সুন্নাহ এর অনুসরণ
আপনি যদি আপনার এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর ব্যপারে যত্নশীল হতে না পারেন তাহলে কিভাবে আপনার শরীরকে ড্রাইভ করে নিয়ে যাবেন চির শান্তির স্থান জান্নাতের পথে? শুধু খাওয়া-দাওয়া আর মৌজ-মাস্তি কিন্তু আপনাকে এই চির কল্যাণ এনে দিনে পারবেনা। কারণ আখিরাতে সঠিক আমলই হবে আপনার হেডলাইট (নূর) যা আপনাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে; ইনশা আল্লাহ।
মজার ব্যাপার হচ্ছে আপনি যখন রাস্তায় গাড়ি ড্রাইভ করেন তখন অন্য যানবাহন থেকে নিজের এত পছন্দের গাড়িকে বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেন; যাতে স্ক্র্যাচ না পড়ে বা অন্য কোন ক্ষতি না হয়। এখন ভেবে দেখুন আপনি নিজেকে কতটুকু ভালবাসেন? আর আপনার উত্তর যদি হয় শতভাগ তাহলে নিজেকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব কার? অবশ্যই আমার এবং আপনার নিজের। সূরা আসর (১০৩) এর আয়াত গুলো দেখুন তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন কিভাবে নিজেকে চুড়ান্ত ক্ষতির (জাহান্নাম) হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন –
শপথ সময়ের – وَالْعَصْرِ
নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; – إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ
কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের – إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
ড্রাইভিং-এর সাথে এই তুলনাকে আক্ষরিক অর্থে না দেখলে আপনি হয়ত বুঝতে পারবেন – আসলেই আমরা সবাই ড্রাইভার আর আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে নিয়ে যেতে পারি সঠিক পথ ধরে চির শান্তির পথে। আর আপনি যখন জান্নাতে বসে আপনার দুনিয়ার জীবনটাকে লুকিং গ্লাস দিয়ে দেখবেন তখন আপনি বুঝবেন আপনি সঠিক জায়গায় পার্কিং করেছেন আর কত নিরাপদে আছেন। আর একটু হলেই হয়ত মহা মাশুল দেওয়া লাগত।
পাদটিকাঃ প্রতিনিয়ত চেষ্টার পাশাপাশি আমাদেরকে সবসময় আল্লাহর কাছে দুআ করে যেতে হবে যেন তিনি আমাদেরকে জীবিত অবস্থায় ইসলামের উপর বহাল রাখেন এবং ঈমানের উপর মৃত্যু দান করেন, কারণ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া চুড়ান্ত সাফল্য লাভ করা, অর্থাৎ জান্নাত লাভ করা, সম্ভব নয়।
Posted on জুন 9, 2012, in Spiritual Purification and tagged অন্তরের পরিশুদ্ধি, জীবনদর্শন. Bookmark the permalink. 2 টি মন্তব্য.
ভালো এনালজি হাসনাত ভাই।
কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়ার জন্য লেখককে অনেক ধন্যবাদ।
লেখকের আরো চমৎকার সব লেখা পড়ার আশায় রইলাম।